ঘড়িয়াল হলো Gavialidae পরিবারভূ্ক্ত একটি বৃহদাকারের কুমির বর্গের (Crocodylia) সরীসৃপ। ইংরেজিতে এদেরকে Gharial বা Fish-eating Crocodile বলা হয় এবং বৈজ্ঞানিক নাম Gavialis gangeticus। বাংলায় এটিকে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘড়িয়াল, ঘড়েল, বাইশাল বা মেছো কুমীর বলেও ডাকা হয়।
ঘড়িয়াল মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের নদীগুলোতে পাওয়া যায় - ভারতের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, চম্বল, মহানন্দী নদীতে। নেপালের নারায়ণী ও রাপ্তি নদীতে এবং অতীতে বাংলাদেশ, ভুটান ও পাকিস্তানেও এদের বিস্তৃতি ছিলো।
আমাদের দেশে পদ্মা ও যমুনাতে এক সময় ভালো পরিমাণেই পাওয়া যেতো, কিন্তু এখন বিলুপ্ত বলে ধরা হয়।
![]() |
ছবি : ঘড়িয়াল ( PC : Earth.com) |
ঘড়িয়াল জলের বাসিন্দা, শুধুমাত্র গভীর ও পরিষ্কার পানির বড় বড় নদীগুলোতে বসবাস করে। মানুষের আনাগোনা কম থাকলে ঐসব নদীর বালুময় চর ও তীরে তাদেরকে রোদ পোহাতে দেখা যায়। রোদ পোহানোর সময় এরা মুখটাকে মস্তবড় হাঁ করে রাখে।
ঘড়িয়ালের দীর্ঘ দেহ , সরু মুখ ও লম্বা চোয়াল মাছ ধরার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ঘড়িয়ালের নাকের আগায় একধরনের ফুলে উঠা অংশ থাকে, যেটাকে বলে “ ঘড়া ” বা “ ghara ” — এখান থেকেই নাম Gharial এসেছে।
পুরুষ ঘড়িয়ালের দৈর্ঘ্য ৫–৬ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে, স্ত্রী ঘড়িয়াল পুরুষের তুলনায় ছোট হয়ে থাকে, প্রায় ৪–৪.৫ মিটার।
ঘড়িয়াল একটি মাছখেকো (Piscivorous) কুমির। তাদের লম্বা, সরু চোয়াল ও ধারালো দাঁত দ্রুত সাঁতরানো মাছ ধরতে বিশেষভাবে অভিযোজিত। তবে ঘড়িয়ালের পছন্দের তালিকায় থাকে আইশঁবিহীন মাছ (যেমনঃ বোয়াল, পাঙ্গাশ, আইড়, গুজি ইত্যাদি)। এসব মাছ রুই, কাতলা, কালিবাউশ, মৃগেল প্রভৃতি মাছের ডিম, পোনা ইত্যাদি খেয়ে সাবাড় করে ফেলে, ঘড়িয়াল সেসব মাংশাসী মাছকে খেয়ে বাস্ততন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। ছোট বাচ্চারা মাঝে মাঝে কীটপতঙ্গ বা ব্যাঙও খায়।
ঘড়িয়ালরা বালুময় নদীর তীরে ডিম পাড়ে, সাধারণত শীতের শেষে বা বসন্তে (মার্চ-এপ্রিল)। মা ঘড়িয়াল নদীর চরে বা বালুময় স্থানে দু-তিন ফুট গভীর গর্ত করে সেখানে একবারে ৩০–৫০টি ডিম পাড়ে। মা ডিম পাহারা দিলেও, অন্যান্য কুমিরের মতো বাচ্চাদের মুখে করে পানিতে নিয়ে যায় না, কারণ ঘড়িয়ালের মুখের গঠন খুব সরু।
অন্যান্য সময় ঘড়িয়াল মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই পানিতে নেমে যায়, কিন্তু ডিম পাশে রাখা মা ঘড়িয়াল কিছুতেই পানিতে নামতে চায় না, এমনকি ঢিল ছুঁড়লেও না।
IUCN বর্তমানে ঘড়িয়ালকে Critically Endangered হিসেবে তাদের রেডলিস্টে স্থান দিয়েছে। বিশ্বে এখন মাত্র ২০০টিরও কম প্রাপ্তবয়স্ক ঘড়িয়াল অবশিষ্ট আছে বলে ধারণা করা হয়।
ঘড়িয়ালের সংখ্যা দিনদিন এতো দ্রুত কমার বেশকিছু কারণ থাকতে পারে। যেমন -
শিকার ও মানুষের হস্তক্ষেপ। বিশেষকরে এদের চামড়া ও মাংসের জন্য আগেকার দিনে নিয়মিতই শিকার করা হতো। তাছাড়া মানুষজন তাদের ডিমকে নষ্ট করে দেয়।
মাছ ধরার সময় জেলেদের জালের ফাঁদে আটকা পড়া, অনেকসময় রোদ পোহাতে আসা ঘড়িয়াল ডাঙায়ও এদের জালে আটকা পড়ে।
নদীর বাঁধ, ড্যাম ও সেচ প্রকল্পে আবাসস্থল নষ্ট হওয়া। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের ঘড়িয়ালদের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
নদী দূষণ ও নদীতে পলি জমা কিংবা নদী থেকে ঘড়িয়ালের খাদ্য মাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়াও কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
ঘড়িয়াল আমাদের পরিবেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান। তারা অন্যান্য কুমিরের মতো মানুষখেকো নয়, শুধুমাত্র মাছ খায়। তাই এদের সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

0 Comments