Advertisement

শঙ্খিনী বা শাখামুটি (Banded Krait)

শঙ্খিনী বাংলাদেশের অন্যতম একটি সুন্দর প্রজাতির সাপ। অতি সুন্দর ও চমৎকার নানা রঙে সজ্জিত এদের দেহ , মাথা আকারে বেশ বড়, কালো রং, পুরো দেহ জুড়ে কালো ও হলুদ ডোরা ডোরা। ইংরেজিতে একে Banded Krait বলে এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Bungarus fasciatus। এলাপিডি পরিবারভূক্ত এই সাপটি ক্রেইটদের মধ্যে সর্ববৃহৎ যা প্রায় ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি (২.৭ মিটার) পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

সারা দেশেই মোটামুটি এদের দেখা যায়। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এদেরকে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়াও দক্ষিন এশিয়া ও দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশে (India, Nepal, Bhutan , Myanmar,Cambodia, Laos, Vietnam , Malaysia, Indonesia, Brunei, Singapore, China) এদের পাওয়া যায়।

এদের বিষ নিউরোটক্সিন ( প্রি এবং পোস্ট সিন্যাপটিক নিউরোটক্সিন) জাতীয় এবং বিষের SCLD50 এর মান 2.4 মিলিগ্রাম /কেজি।



ছবি : শঙ্খিনী ( PC : Wikipedia) 

এতো মারাত্মক বিষ বহনকারী হয়েও এরা শান্ত স্বভাবের এবং মানুষকে কামড়ায় না, তবে বিরক্ত করলে ছুবল বসিয়ে দিতে পারে। এদের বিষক্রিয়ার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বমি হওয়া, পেটে ব্যাথা, ডায়রিয়া, মাথাব্যাথা, শ্বাসযন্ত্র ধ্বংস হওয়া, কিডনি বিকল হওয়া এবং শ্বাসকার্য বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে মৃত্যু ঘঠা।

এরা মাংসাশী তাই এদের প্রধান খাবার মূলত অন্যান্য বিষধর ও বিষহীন সাপ। এছাড়াও ইঁদুর, সাপের ডিম, ব্যাঙ, মাছ প্রভৃতিও খেয়ে থাকে । খাদ্য তালিকায় রয়েছে খৈয়া গোখরা,পদ্ম গোখরা, চন্দ্রবোড়ার (Russell’s Viper) মতো মারাত্মক বিষধর সাপগুলোও। এদেরকে প্রায়ই জলঢোড়া খেতে দেখা যায়। এদেরকে অন্যান্য সাপরা ভয় পায়। এজন্য শঙ্খিনী যেখানে বসবাস করে তার প্রায় ১০০ মিটার এরিয়ার ভিতরে অন্য কোনো বিষধর প্রজাতির সাপ প্রবেশ করতে পারে না । 

শঙ্খিনী সাপকে এলাকা বিশেষে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন : বাড়িফইরল/বাড়ির রাখাল/হাখানী/পাটুয়া হাফ (সিলেট/মৌলভীবাজার) , রাজসাপ (মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ), রাশ সাপ/শাঁখামুঠি (বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ), হানি হাঁপ (চাঁদপুর), আঁনি হাপ (চট্টগ্রাম দক্ষিনাঞ্চল), হানি হাফ (কুমিল্লা), সাপিনী (বাগেরহাট), গারোগালি/গালগোহালী/শাখাতিয়া (পঞ্চগড়), চাকাতি সাপ (দিনাজপুর), সাপনী সাপ (মোংলা), গারোগুয়ালী (ঠাকুরগাঁও), সাইক্যানি/সাকাতি সাপ (রংপুর), সঙ্গিনী হাপ (মিরসরাই), হনি হাপ (নোয়াখালী), হোঁয়ানি হাপ/হকনি হাপ (লক্ষীপুর), দুমোখো সাপ (পটুয়াখালী), আই-নাপ (চকরিয়া), আনি আপ (কক্সবাজার), হককুনি হাপ (সন্দীপ) ইত্যাদি। 

শঙ্খিনী বর্ষায় ডিম দেয় ও বাচ্চা ফুটায়। স্ত্রী সাপ এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ৪-১৪টি ডিম দেয় এবং ডিম পরিস্ফুটন হতে ৬১ দিন লাগে।

বাণিজ্যিকভাবেও শঙ্খিনী মূল্যবান। এই সাপের বিষ খুব দামি এবং এর চামড়ার বাজার মুল্যও বেশি।

শঙ্খিনী প্রধানত নিশাচর, তাই রাতের বেলায় বের হয়। ইঁদুরের গর্ত, ইটের স্তুপের ফাঁকে কিংবা উইয়ের ঢিবিতে থাকতে পছন্দ করে।

 বাংলাদেশের মানুষ সাপটিকে নির্বিচারে মেরে ফেলার কারণে এখন তারা বিপন্ন প্রজাতি। এরা মানুষকে এড়িয়ে চলে , খুবই লাজুক প্রকৃতির সাপ। তাই, শঙ্খিনীকে না মেরে এদের সংরক্ষণে আমাদেরকে সচেষ্ট হতে হবে।

Post a Comment

0 Comments